
জামালপুরের দুর্গম চরাঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা/ চিকিৎসা, শিক্ষা ও যোগাযোগে পিছিয়ে যমুনার চরবাসী; নাগরিক সুবিধার দাবিতে বাড়ছে ক্ষোভ
এনামুল হক :
নদী ভাঙে, চর জাগে। আবার সেই জেগে ওঠা চরেই গড়ে ওঠে মানুষের নতুন বসতি। বছরের পর বছর এভাবেই যমুনার সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে বাড়ে ভাঙন ও বন্যার আতঙ্ক, আর পানি কমলে সামনে আসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও নিত্যদিনের নানা দুর্ভোগ।
যমুনার বুকের এসব দুর্গম চরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। অথচ স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও তারা এখনো পাচ্ছেন না নাগরিক জীবনের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। নেই স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ও আধুনিক যোগাযোগ। ফলে প্রতিদিনই যেন তাদের জীবন কাটছে বেঁচে থাকার এক কঠিন সংগ্রামে।
বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার চিত্র সবচেয়ে করুণ। সাপধরী ও চিনাডুলী ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলে রয়েছে মাত্র দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়মিত খোলা পাওয়া যায় না। ফলে অসুস্থ হলে চরবাসীর শেষ ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
সাপধরী মন্ডলপাড়া গ্রামের আমিনুর ইসলাম বলেন, ইউনিয়নজুড়ে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও মাসে এক-দুদিন স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা যায়। অধিকাংশ সময়ই ক্লিনিক বন্ধ থাকে। ফলে চিকিৎসা নিতে তাদের উপজেলা সদরে যেতে হয়।
চরাঞ্চলের স্বাস্থ্য সংকট সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে ওঠে প্রসূতি মায়েদের ক্ষেত্রে। প্রসববেদনা উঠলে উত্তাল যমুনা পাড়ি দিয়ে নৌকায় করে যেতে হয় হাসপাতালে। রাতের অন্ধকার, নদীর ঢেউ আর দীর্ঘ পথ সব মিলিয়ে প্রতিটি যাত্রাই হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর লড়াই। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে প্রতিনিয়ত।
এরই বাস্তব চিত্র দেখা যায় চর শিশুয়া গ্রামের আকলিমা বেগমের ক্ষেত্রে। ১০ মাস বয়সী অসুস্থ শিশুকে নিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে এসে সেটি বন্ধ দেখতে পান তিনি। চিকিৎসা না পেয়েই ফিরতে হয় তাকে। দুর্গম চরে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় উপজেলা হাসপাতালই তাদের শেষ আশ্রয়।
শুধু চিকিৎসা নয়, শিক্ষাতেও পিছিয়ে রয়েছে চরাঞ্চলের শিশুরা। দুর্গম এলাকাগুলোতে রয়েছে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাত্র একটি উচ্চ বিদ্যালয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও বিদ্যালয় ভবন থাকলেও নিয়মিত পাঠদান হয় না। শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, যোগাযোগ সংকট এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে দিন দিন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে শিশুরা।
সাপধরী এলাকার আব্দুল হাকিম প্রামাণিক বলেন, বিদ্যালয় ভবন থাকলেও অনেক শিক্ষক নদী পার হয়ে নিয়মিত আসতে চান না। ফলে শিক্ষার্থীরাও স্কুলমুখী হতে চায় না। বিশেষ করে নদীর পানি কমে গেলে যোগাযোগ সংকট আরও বেড়ে যায়। বিদ্যালয়ে পড়াশোনা কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেক অভিভাবক সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করছেন।
একই এলাকার আবেদ আকন্দের কণ্ঠে ঝরে পড়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও আক্ষেপ। তিনি বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ যেন অবহেলিত। মনে হয় তারা এ দেশের নাগরিক নয়। তা না হলে শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবা এত দুর্বল থাকার পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
চরবাসীর দাবি, শুধু আশ্বাস নয় দুর্গম চরাঞ্চলে স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে এবং উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সাপধরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম মন্ডল বলেন, উপজেলা সদর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন সাপধরীর দুর্গম চরাঞ্চল। চরবাসীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।
এদিকে দুর্গম চরাঞ্চলগুলো ইতোমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো.জুবায়ের।
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে যমুনার বুকে বসতি গড়ে তোলা মানুষগুলো অভ্যস্ত প্রতিকূলতার সঙ্গে। নদীভাঙনে ঘর হারান, বন্যায় ফসল হারান, আবার নতুন চরে নতুন করে জীবন শুরু করেন। কিন্তু প্রকৃতির এই লড়াইয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগের মতো মৌলিক অধিকার পাওয়ার জন্যও যদি প্রতিদিন তাদের যুদ্ধ করতে হয় তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে তারা কতটা দূরে?
যমুনার বুকের এই মানুষগুলো দয়া নয়, চান তাদের ন্যায্য নাগরিক অধিকার। তাদের দাবি প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার এই কঠিন জীবনে অন্তত রাষ্ট্র যেন তাদের পাশে দাঁড়ায়।
নিউজ ডেস্ক 









