ঢাকা ০৩:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তৃণমূলের রাজনীতি থেকে নেতৃত্বে, ঠাকুরগাঁও বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন

  • নিউজ ডেস্ক
  • প্রকাশের সময়: ১০:২৮:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 46

তৃণমূলের রাজনীতি থেকে নেতৃত্বে, ঠাকুরগাঁও বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন

 

পারিবারিকভাবে রাজনীতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকলেও নিজের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছেন দীর্ঘদিনের তৃণমূলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। ব্যাংকের নিশ্চিত পেশাগত জীবন ছেড়ে রাজনীতিতে পূর্ণকালীনভাবে যুক্ত হওয়া থেকে শুরু করে পৌর মেয়র, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতি—চার দশকের বেশি সময়ের এই রাজনৈতিক পথচলায় ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন মির্জা ফয়সল আমীন।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে দীর্ঘ সময় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় সরকার পর্যায়েও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার
মির্জা ফয়সল আমীন এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যে পরিবারের সঙ্গে ঠাকুরগাঁও ও বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।
তাঁর পিতা মরহুম মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন শিক্ষক ও পরবর্তীতে ব্যবসায়ী। তিনি পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি তিনি ভূমি ও কৃষি—দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে তাঁর ভূমিকার কথা স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
তাঁর চাচা মরহুম মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের একজন। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং আইন ও ভূমিমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা ফয়সল আমীনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মহাসচিব হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তবে পরিবারের এই রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নিজের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরিতে মির্জা ফয়সল আমীন দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় রয়েছেন।
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মির্জা ফয়সল আমীনের শিক্ষাজীবনের শুরু ঠাকুরগাঁওয়ে। তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
শিক্ষাজীবন শেষে সরাসরি রাজনীতিতে না গিয়ে প্রথমে তিনি পেশাগত জীবন বেছে নেন। দেশের অন্যতম আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়।
কিন্তু সেই পেশাগত জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রাজনীতি ও নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ শেষ পর্যন্ত তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ঠাকুরগাঁওয়ে।
১৯৭৯ সালে রাজনৈতিক সক্রিয়তার শুরু
মির্জা ফয়সল আমীনের রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক অধ্যায় শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। সে সময় তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিনের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচনী ও মাঠপর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে।
পরিবারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কাছ থেকে দেখা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নির্বাচনী মাঠের অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
এরপর ধীরে ধীরে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাজ করে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত হন।
১৯৯১ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন রাজনীতি
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে ১৯৯১ সালে। সে সময় তিনি ব্যাংকিং খাতের নিশ্চিত পেশাগত জীবন ছেড়ে স্থায়ীভাবে ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরে আসেন এবং পূর্ণকালীনভাবে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন।
এরপর স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাজ করে সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার কার্যক্রমে যুক্ত হন। সময়ের সঙ্গে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা আরও বাড়তে থাকে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন জাতীয় রাজনীতির ভার সামলাচ্ছিলেন, তখন ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন মির্জা ফয়সল আমীন। জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা এবং সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখায় তিনি ভূমিকা রাখেন।
২০১৫ সালে পৌর মেয়র নির্বাচিত
মির্জা ফয়সল আমীনের রাজনৈতিক জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ২০১৫ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচন।
প্রতিকূল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর নাগরিক সেবা, পৌর অবকাঠামো এবং শহরের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে তিনি যুক্ত হন।
দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি সরাসরি জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের এই অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক থেকে সভাপতি
দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে কাজ করার পর ২০১৭ সালে মির্জা ফয়সল আমীন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রায় আট বছর তিনি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন। এ সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা, তৃণমূলের বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয়, দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখা এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে সংগঠনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপির সম্মেলনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক থেকে সভাপতি নির্বাচিত হওয়া তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পথচলার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
৫ আগস্টের পর সম্প্রীতি রক্ষায় সক্রিয়তা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকার মতো ঠাকুরগাঁওয়েও আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এ সময় মির্জা ফয়সল আমীন স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে সহিংসতা ও অরাজকতা প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নেন বলে জানা যায়।
বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন এলাকায় পাহারার ব্যবস্থা এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তিনি যুক্ত ছিলেন। অস্থিরতার মধ্যে লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারের পর প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এ সময় তাঁর রাজনৈতিক বার্তার অন্যতম বিষয় ছিল—রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় বা সাধারণ নাগরিক যেন প্রতিহিংসা ও সহিংসতার শিকার না হন।
তৃণমূলকেন্দ্রিক রাজনীতিই প্রধান শক্তি
দলীয় নেতাকর্মীদের মামলা-মোকদ্দমা ও রাজনৈতিক সংকটে সহায়তা, কর্মীদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যায় পাশে থাকা এবং দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখার প্রচেষ্টার কারণে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর একটি নিজস্ব সাংগঠনিক অবস্থান তৈরি হয়েছে।
তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সংগঠনকেন্দ্রিক রাজনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।
চার দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক পথচলা
১৯৭৯ সালে পিতা মির্জা রুহুল আমিনের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয়তা, ১৯৯১ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ, ২০১৫ সালে পৌর মেয়র নির্বাচিত হওয়া, ২০১৭ সালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ এবং ২০২৫ সালে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হওয়া—মির্জা ফয়সল আমীনের রাজনৈতিক জীবন মূলত তৃণমূল থেকে নেতৃত্বে উঠে আসার একটি দীর্ঘ পথচলা।
রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, দীর্ঘ সময় ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দলকে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী করা, তৃণমূলের ঐক্য ধরে রাখা এবং স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করাই মির্জা ফয়সল আমীনের সামনে বড় দায়িত্ব।

ট্যাগ:
রিপোর্টারের সম্পর্কে

ইসলামপুরে নেই এসিল্যান্ড, ব্যাহত ভূমি সেবা

তৃণমূলের রাজনীতি থেকে নেতৃত্বে, ঠাকুরগাঁও বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন

প্রকাশের সময়: ১০:২৮:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তৃণমূলের রাজনীতি থেকে নেতৃত্বে, ঠাকুরগাঁও বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন

 

পারিবারিকভাবে রাজনীতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকলেও নিজের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছেন দীর্ঘদিনের তৃণমূলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। ব্যাংকের নিশ্চিত পেশাগত জীবন ছেড়ে রাজনীতিতে পূর্ণকালীনভাবে যুক্ত হওয়া থেকে শুরু করে পৌর মেয়র, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতি—চার দশকের বেশি সময়ের এই রাজনৈতিক পথচলায় ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন মির্জা ফয়সল আমীন।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে দীর্ঘ সময় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় সরকার পর্যায়েও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার
মির্জা ফয়সল আমীন এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যে পরিবারের সঙ্গে ঠাকুরগাঁও ও বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।
তাঁর পিতা মরহুম মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন শিক্ষক ও পরবর্তীতে ব্যবসায়ী। তিনি পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি তিনি ভূমি ও কৃষি—দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে তাঁর ভূমিকার কথা স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
তাঁর চাচা মরহুম মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের একজন। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং আইন ও ভূমিমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা ফয়সল আমীনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মহাসচিব হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তবে পরিবারের এই রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নিজের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরিতে মির্জা ফয়সল আমীন দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় রয়েছেন।
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মির্জা ফয়সল আমীনের শিক্ষাজীবনের শুরু ঠাকুরগাঁওয়ে। তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
শিক্ষাজীবন শেষে সরাসরি রাজনীতিতে না গিয়ে প্রথমে তিনি পেশাগত জীবন বেছে নেন। দেশের অন্যতম আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়।
কিন্তু সেই পেশাগত জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রাজনীতি ও নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ শেষ পর্যন্ত তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ঠাকুরগাঁওয়ে।
১৯৭৯ সালে রাজনৈতিক সক্রিয়তার শুরু
মির্জা ফয়সল আমীনের রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক অধ্যায় শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। সে সময় তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিনের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচনী ও মাঠপর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে।
পরিবারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কাছ থেকে দেখা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নির্বাচনী মাঠের অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
এরপর ধীরে ধীরে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাজ করে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত হন।
১৯৯১ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন রাজনীতি
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে ১৯৯১ সালে। সে সময় তিনি ব্যাংকিং খাতের নিশ্চিত পেশাগত জীবন ছেড়ে স্থায়ীভাবে ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরে আসেন এবং পূর্ণকালীনভাবে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন।
এরপর স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাজ করে সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার কার্যক্রমে যুক্ত হন। সময়ের সঙ্গে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা আরও বাড়তে থাকে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন জাতীয় রাজনীতির ভার সামলাচ্ছিলেন, তখন ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন মির্জা ফয়সল আমীন। জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা এবং সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখায় তিনি ভূমিকা রাখেন।
২০১৫ সালে পৌর মেয়র নির্বাচিত
মির্জা ফয়সল আমীনের রাজনৈতিক জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ২০১৫ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচন।
প্রতিকূল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর নাগরিক সেবা, পৌর অবকাঠামো এবং শহরের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে তিনি যুক্ত হন।
দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি সরাসরি জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের এই অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক থেকে সভাপতি
দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে কাজ করার পর ২০১৭ সালে মির্জা ফয়সল আমীন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রায় আট বছর তিনি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন। এ সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা, তৃণমূলের বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয়, দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখা এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে সংগঠনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপির সম্মেলনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক থেকে সভাপতি নির্বাচিত হওয়া তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পথচলার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
৫ আগস্টের পর সম্প্রীতি রক্ষায় সক্রিয়তা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকার মতো ঠাকুরগাঁওয়েও আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এ সময় মির্জা ফয়সল আমীন স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে সহিংসতা ও অরাজকতা প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নেন বলে জানা যায়।
বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন এলাকায় পাহারার ব্যবস্থা এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তিনি যুক্ত ছিলেন। অস্থিরতার মধ্যে লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারের পর প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এ সময় তাঁর রাজনৈতিক বার্তার অন্যতম বিষয় ছিল—রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় বা সাধারণ নাগরিক যেন প্রতিহিংসা ও সহিংসতার শিকার না হন।
তৃণমূলকেন্দ্রিক রাজনীতিই প্রধান শক্তি
দলীয় নেতাকর্মীদের মামলা-মোকদ্দমা ও রাজনৈতিক সংকটে সহায়তা, কর্মীদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যায় পাশে থাকা এবং দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখার প্রচেষ্টার কারণে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর একটি নিজস্ব সাংগঠনিক অবস্থান তৈরি হয়েছে।
তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সংগঠনকেন্দ্রিক রাজনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।
চার দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক পথচলা
১৯৭৯ সালে পিতা মির্জা রুহুল আমিনের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয়তা, ১৯৯১ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ, ২০১৫ সালে পৌর মেয়র নির্বাচিত হওয়া, ২০১৭ সালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ এবং ২০২৫ সালে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হওয়া—মির্জা ফয়সল আমীনের রাজনৈতিক জীবন মূলত তৃণমূল থেকে নেতৃত্বে উঠে আসার একটি দীর্ঘ পথচলা।
রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, দীর্ঘ সময় ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দলকে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী করা, তৃণমূলের ঐক্য ধরে রাখা এবং স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করাই মির্জা ফয়সল আমীনের সামনে বড় দায়িত্ব।