
ইসলামপুরে ভবঘুরে কিশোরের বিরল ভালোবাসা, সঙ্গী পথকুকুর
মোঃ এনামুল হক :-
যেখানে আপনজনরাই ফেলে যায়, সেখানে এক পথকুকুর হয়ে ওঠে সবচেয়ে আপন। এক ভবঘুরে কিশোর আর তার নীরব সঙ্গীর গল্প, যেখানে ক্ষুধা আছে, কষ্ট আছে, তবুও ভালোবাসা আছে নিঃস্বার্থ। বেওয়ারিশ কুকুরকে যেখানে মানুষের ভয়, সেখানে এই পথশিশুর একমাত্র সঙ্গী কুকুর। সারদিন কুকুরের সাথে খুনসুটি, দুষ্টুমি, করেই কাটে তার সময়। পথশিশু শ্রাবণের নিজ ঘরে হয়নি ঠাই ,বাবা আর সৎমা বের করে দিয়েছে ঘর থেকে, সেই থেকেই ঠিকানাহীন শ্রাবণ আজ এখানে তো কাল ওখানে ঘুরে বেড়ায় তার সাথি কুকুর দুটিকে নিয়ে। মানুষের দেওয়া খাবার ভাগ করেই খায় কুকুর দুটির সাথে।
ইসলামপুর বাজার রেলস্টেশনে ব্যাবসায়ী মো,আলম মিয়া জানান, এই ছেলেটিকে বেশকিছু দিন থেকে দুটি কুকুরের সাথে দেখা যায়,দিনরাত একসাথেই থাকে ছেলেটিকে কেউ কোন খাবার দিলে তা কুকুর দুটিকে সাথে নিয়ে ভাগাভাগি করে খায়।
স্টেশন এলাকার বাসিন্দা মো, বান্তু সেখ জানান, ছেলেটি কুকুর দুটির সাথে ঘুমায়, ছেলেটি যেখানেই যায়, কুকুর দুটিও তার সাথেই সেখানে যায়।
কুকুরটি কথা বলতে পারে না তবুও তার চোখে আছে ভাষা ভালোবাসার, নিরাপত্তার, আর না ছাড়ার প্রতিশ্রুতি। রাতের অন্ধকারে, যখন শহর ঘুমিয়ে পড়ে এই কুকুরটাই জেগে থাকে,পাহারা দেয় তার একমাত্র খেলার সাথিটিকে।
পথশিশু শ্রাবণ জানায়, শেরপুর জেলার সদর উপজেলার কুসুমহাটি এলাকার রুবেল মিয়ার সন্তান সে। বাবা ও সৎমা তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে বলেও দাবী এই কিশোরের। বর্তমান সে জামালপুরের ইসলামপুর রেলস্টেশনে প্লাটফর্মে রয়েছে বেশকিছু দিন থেকে।
আপনজন পাশে নেই, নেই ঘুমানোর জায়গায় তবুও এই কিশোর বেঁচে আছে কারণ সে একা না।
পরিবার থেকে বিতাড়িত এই শিশুটির জীবনে একমাত্র নির্ভরতা এই পথকুকুর। ক্ষুধার্ত পেটে যখন খাবার জোটে না, তখনও সে নিজের অংশটুকু তুলে দেয় তার প্রিয় সঙ্গীর মুখে। কারণ, সে জানে এই পৃথিবীতে সবাই ছেড়ে গেলেও, এই কুকুরটা তাকে ছেড়ে যাবে না। পরিবার থেকে বিছিন্ন ১১বছর বয়সী পথশিশু শ্রাবন জানায়, তার মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে, বাবাও তার খুঁজ রাখে না ঘরে রয়েছে সৎমা, পরিবারের অবহেলার কারণে আজ সে ভবঘুরে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বেওয়ারিশ কুকুরের শরীরে যেহেতু র্যাবিস ভাইরাসের থাকে পারে, তাই ভাইরাস প্রতিশোধক টিকা না নিয়ে এভাবে কুকুরের সাথে মিশলে জলাতঙ্ক রোগ হওয়ার সম্ভবনা অনেকাংশেই থাকে বলে ধারণা তাদের। এধরণের পথশিশুদের পুর্নবাসন করাটা জরুরি বলে মনে করেন সমাজকর্মীরা।
এবিষয়ে শিক্ষক, নাট্যকার ও সমাজকর্মী, সৈয়দ মাসুদ রাজা বলেন, সখ্যতা শুধু মানুষে মানুষেই হবে তা নয়, মানুষ ও প্রানীর মধ্যেও এটা হতে পারে,যেহেতু বেওয়ারিশ কুকুরের শরীরে জলাতঙ্ক রোগ বহন করে, তাই শিশুটির স্বাস্থ্যঝুকি রয়েছে। সরকারিভাবে প্রতিশোধক টিকা সরবরাহ করা উচিত বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে। এবং এধরণের পথশিশুদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় এনে পূর্ণবাসন করার অনুরোধও করেন এই সমাজকর্মী।
কিশোরটি কুকুরটিকে জড়িয়ে ধরে আছে, দু’জনেই ক্লান্ত, তবুও একসাথে। সমাজ তাদের দিয়েছে অবহেলা, জীবন দিয়েছে কষ্ট তবুও তারা খুঁজে নিয়েছে ভালোবাসা, একটা নিঃস্বার্থ, নিঃশব্দ ভালোবাসা। যেখানে নেই কোনো স্বার্থ, নেই কোনো প্রতারণা আছে শুধু পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি। এই ছোট্ট গল্পটি শুধু একটি কিশোর আর একটি কুকুরের নয় এটি আমাদের মানবিকতার আয়না।
আমরা যেখানে মানুষ হয়েও মানুষকে ভুলে যাই,
সেখানে এক পথকুকুর শিখিয়ে দেয় ভালোবাসা মানে পাশে থাকা, শেষ পর্যন্ত পাশে থাকা।
নিউজ ডেস্ক 












