ঢাকা ০১:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইসলামপুরে জ্বালানি তেল সংকটে সেচ ব্যাহত, বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কা কৃষকের

  • নিউজ ডেস্ক
  • প্রকাশের সময়: ০৫:১৭:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
  • 8

ইসলামপুরে জ্বালানি তেল সংকটে সেচ ব্যাহত, বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কা কৃষকের

মোঃ এনামুল হক
ইসলামপুর জামালপুর প্রতিনিধি

জ্বালানি তেলের সংকটে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
বোরো চাষের গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে সেচ দিতে না পারলে ফলন অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা করছেন কৃষক।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের শীলদহ গ্রামের কৃষক সাজু শেখ এ বছর দুই বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। গত ৪-৫ দিন আগে একদিনের বৃষ্টিতে জমিতে কিছুটা পানি জমলেও গত ২ দিন ধরে তা পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। কিন্তু ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে পাশের ঘের থেকে সেচ দিতে পারছেন না তিনি। কারণ, কোথাও জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না।

এই প্রান্তিক কৃষক বলেন, ‘পাশের একটি পেট্রল পাম্পে কয়েকবার গেলেও সেখানে গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পাত্রে তেল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এই মুহূর্তে সেচ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এখন সেচ দিতে না পারলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঠিকমতো পানি না পেলে ধানগাছ শুকিয়ে যাবে, থোড় বের হবে না, পোকা লাগার আশঙ্কাও আছে। ফলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসবে।’
নিজের জমির সম্ভাব্য ফলনের হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, সাধারণত তার জমিতে ৪৫-৫০ মণ হারে প্রায় ১০০ মণ ধান হওয়ার কথা। কিন্তু সেচ সংকটের কারণে তা কমে ৪০-৫০ মণ হতে পারে।
উপজেলা শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে যমুনা নদীর চর জেগে ওঠা জমি ধারে, আজ ৩১মার্চ মঙ্গলবার সকালে তাকে দেখা যায় পাম্প মেশিনের পরিবর্তে হাত দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। জমিতে যে অল্প পানি আছে, সেটি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

তার পাশের জমির কৃষক ইসমাঈল ও একই সংকটে পড়েছেন। ৩ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন তিনি। প্রতি ৫ দিন পরপর সেচ দিতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৩ লিটার তেল। কিন্তু গত ১০-১২ দিন ধরে কোথাও তেল পাচ্ছেন না তিনি।
ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমাদের চরাঞ্চলের যমুনা নদী পার হয়ে পৌরসভার ঝর্না ফিলিং স্টেশনে ২-৩ বার গেছি। কিন্তু তারা শুধু গাড়িতে তেল দিচ্ছে, পাত্রে দিচ্ছে না।’

‘খোলা বাজারে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা দিয়ে তেল কিনতে হচ্ছে। এ সময় কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়া উচিত। না হলে বড় ক্ষতি হবে,’ বলেন তিনি।
উপজেলার সাপধরী ইউনিয়নের শিশুয়া গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম এ বছর ৫ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। জ্বালানি সংকটের কারণে তিনিও খোলা বাজার থেকে বেশি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
আরও বলেন ‘একদিন সেচ দিলে দেড় দিন লাগে না। কিন্তু একদিন সেচ দিতেই আমার ৪ লিটার তেল লাগে। গত ১৫ দিন ধরে ১৩০-১৩৫ টাকা দরে উলিয়া বাজার থেকে তেল কিনছি। তাও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। ওই বাজারে দুটি দোকান ছিল, তার মধ্যে একটি তেলের সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে।’
তিনি এ সমস্যার সমাধানে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ সংকটে শুধু কৃষকরাই নন, ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষও। উপজেলার নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের কাঠমা গ্রামের জহুরুল ইসলাম জানান, তার মুরগির খামার ও সেচের জন্য ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু একতা বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও গত কয়েকদিনে কোথাও তেল পাননি।
উপজেলার কয়েক টা বাজারে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও খোলা বাজারে তেল বিক্রি হলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম।
ইসলামপুর উপজেলার দেওয়ানগঞ্জ – জামালপুর মোশারফগঞ্জ মহাসড়কের পাশে একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে নেট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, যেন গ্রাহকরা ভেতরে ঢুকতে না পারেন। সেখানে নোটিশে লেখা—’তেল নাই’। সেখানে কর্মরতরা জানান, তেল পেলেই পাম্প চালু করা হবে।

ফিলিং স্টেশনটির মালিক জনি মিয়া বলেন, গত শনিবারে মাত্র ২ হাজার লিটার অকটেন পেয়েছি। তা দিয়েই সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। গতকাল ডিপো থেকে কোনো অকটেন পাইনি। এ মাসে আমার ফিলিং স্টেশনের জন্য মাত্র ৩ হাজার লিটার পেট্রল পেয়েছি।’
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিটি প্রাইভেট কারে ১০ লিটার, পাজেরো গাড়িতে ২০ লিটার ও মোটরসাইকেলে ৩০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে।
সাধারণত তার স্টেশনে দৈনিক ২৫০০ থেকে ২৬০০ লিটার অকটেন বিক্রি হয়। তবে ঈদের সময় গাড়ির চাপ বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদে লক্ষ্যমাত্রা ১৭ হাজার ২৩১হেক্টর।
ইসলামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘বর্তমানে বোরো ধান বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ জমিতে ধান চারা থেকে ছড়া তৈরির পর্যায়ে, মাত্র ৪ শতাংশ জমিতে ধান হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে।’
তার দাবি, বোরো আবাদে সমস্যা হবে না, ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে।

ট্যাগ:
রিপোর্টারের সম্পর্কে

জনপ্রিয় খবর

ইসলামপুরে জ্বালানি তেল সংকটে সেচ ব্যাহত, বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কা কৃষকের

ইসলামপুরে জ্বালানি তেল সংকটে সেচ ব্যাহত, বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কা কৃষকের

প্রকাশের সময়: ০৫:১৭:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

ইসলামপুরে জ্বালানি তেল সংকটে সেচ ব্যাহত, বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কা কৃষকের

মোঃ এনামুল হক
ইসলামপুর জামালপুর প্রতিনিধি

জ্বালানি তেলের সংকটে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
বোরো চাষের গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে সেচ দিতে না পারলে ফলন অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা করছেন কৃষক।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের শীলদহ গ্রামের কৃষক সাজু শেখ এ বছর দুই বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। গত ৪-৫ দিন আগে একদিনের বৃষ্টিতে জমিতে কিছুটা পানি জমলেও গত ২ দিন ধরে তা পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। কিন্তু ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে পাশের ঘের থেকে সেচ দিতে পারছেন না তিনি। কারণ, কোথাও জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না।

এই প্রান্তিক কৃষক বলেন, ‘পাশের একটি পেট্রল পাম্পে কয়েকবার গেলেও সেখানে গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পাত্রে তেল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এই মুহূর্তে সেচ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এখন সেচ দিতে না পারলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঠিকমতো পানি না পেলে ধানগাছ শুকিয়ে যাবে, থোড় বের হবে না, পোকা লাগার আশঙ্কাও আছে। ফলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসবে।’
নিজের জমির সম্ভাব্য ফলনের হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, সাধারণত তার জমিতে ৪৫-৫০ মণ হারে প্রায় ১০০ মণ ধান হওয়ার কথা। কিন্তু সেচ সংকটের কারণে তা কমে ৪০-৫০ মণ হতে পারে।
উপজেলা শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে যমুনা নদীর চর জেগে ওঠা জমি ধারে, আজ ৩১মার্চ মঙ্গলবার সকালে তাকে দেখা যায় পাম্প মেশিনের পরিবর্তে হাত দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। জমিতে যে অল্প পানি আছে, সেটি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

তার পাশের জমির কৃষক ইসমাঈল ও একই সংকটে পড়েছেন। ৩ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন তিনি। প্রতি ৫ দিন পরপর সেচ দিতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৩ লিটার তেল। কিন্তু গত ১০-১২ দিন ধরে কোথাও তেল পাচ্ছেন না তিনি।
ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমাদের চরাঞ্চলের যমুনা নদী পার হয়ে পৌরসভার ঝর্না ফিলিং স্টেশনে ২-৩ বার গেছি। কিন্তু তারা শুধু গাড়িতে তেল দিচ্ছে, পাত্রে দিচ্ছে না।’

‘খোলা বাজারে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা দিয়ে তেল কিনতে হচ্ছে। এ সময় কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়া উচিত। না হলে বড় ক্ষতি হবে,’ বলেন তিনি।
উপজেলার সাপধরী ইউনিয়নের শিশুয়া গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম এ বছর ৫ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। জ্বালানি সংকটের কারণে তিনিও খোলা বাজার থেকে বেশি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
আরও বলেন ‘একদিন সেচ দিলে দেড় দিন লাগে না। কিন্তু একদিন সেচ দিতেই আমার ৪ লিটার তেল লাগে। গত ১৫ দিন ধরে ১৩০-১৩৫ টাকা দরে উলিয়া বাজার থেকে তেল কিনছি। তাও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। ওই বাজারে দুটি দোকান ছিল, তার মধ্যে একটি তেলের সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে।’
তিনি এ সমস্যার সমাধানে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ সংকটে শুধু কৃষকরাই নন, ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষও। উপজেলার নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের কাঠমা গ্রামের জহুরুল ইসলাম জানান, তার মুরগির খামার ও সেচের জন্য ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু একতা বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও গত কয়েকদিনে কোথাও তেল পাননি।
উপজেলার কয়েক টা বাজারে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও খোলা বাজারে তেল বিক্রি হলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম।
ইসলামপুর উপজেলার দেওয়ানগঞ্জ – জামালপুর মোশারফগঞ্জ মহাসড়কের পাশে একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে নেট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, যেন গ্রাহকরা ভেতরে ঢুকতে না পারেন। সেখানে নোটিশে লেখা—’তেল নাই’। সেখানে কর্মরতরা জানান, তেল পেলেই পাম্প চালু করা হবে।

ফিলিং স্টেশনটির মালিক জনি মিয়া বলেন, গত শনিবারে মাত্র ২ হাজার লিটার অকটেন পেয়েছি। তা দিয়েই সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। গতকাল ডিপো থেকে কোনো অকটেন পাইনি। এ মাসে আমার ফিলিং স্টেশনের জন্য মাত্র ৩ হাজার লিটার পেট্রল পেয়েছি।’
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিটি প্রাইভেট কারে ১০ লিটার, পাজেরো গাড়িতে ২০ লিটার ও মোটরসাইকেলে ৩০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে।
সাধারণত তার স্টেশনে দৈনিক ২৫০০ থেকে ২৬০০ লিটার অকটেন বিক্রি হয়। তবে ঈদের সময় গাড়ির চাপ বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদে লক্ষ্যমাত্রা ১৭ হাজার ২৩১হেক্টর।
ইসলামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘বর্তমানে বোরো ধান বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ জমিতে ধান চারা থেকে ছড়া তৈরির পর্যায়ে, মাত্র ৪ শতাংশ জমিতে ধান হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে।’
তার দাবি, বোরো আবাদে সমস্যা হবে না, ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে।